যে অভ্যাস গুলো মানুষের জীবনে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে

মানুষের জীবনের অনেক দোষ-গুন রয়েছে, তার মধ্যেও কিছু খারাপ গুন মানুষের মধ্যে থাকে, যে অভ্যাস গুলো মানুষের জীবনে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। আমরা পার্থিব জীবনে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হই, ধৈর্য ধারন করে সেসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। তাহলে আমরা জীবনে কিছুটা উন্নতি করতে পারবো।

যে অভ্যাস গুলো মানুষের জীবনে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে
যে অভ্যাস গুলো মানুষের জীবনে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে

আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের কথা ভাবতে হবে। তাহলে আমরা সঠিক পথে জীবন পরিচালিত করতে পারবো। নিচে জীবন ধ্বংসকারী কিছু অভ্যাসের কথা বলা হলো-

Table of Contents

১. আমাদের অপরিশুদ্ধ অন্তর :

মানুষের জীবনে অপরিশুদ্ধ অন্তর সবচেয়ে বড় শত্রু । অপরিশুদ্ধতা অন্তর এর চাহিদা মেটাতে গিয়ে মানুষ নিজেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনে। দুনিয়া ও আসমানবাসী সকলের নিকট সে ঘৃণিত করে তোলে। অপরিশুদ্ধ অন্তর মানুষকে সবসময় অন্যায় ও খারাপ কাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আমাদের পবিত্র আল কোরআনে ইরশাদ করা হয়েছে যে, ‘আর আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না ‘ কেননা নিশ্চয় মানুষের নাফস খারাপ বা পাপ কাজের নির্দেশ দেয়; কিন্তু সে নয়, যাদের প্রতি আমার রব দয়া করেন। নিশ্চয় আপনারা জানেন, আমার রব অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত নং : ৫৩)

২. আমাদের কৃপণতা :

অনেক মানুষ মনে করেন যে একটু কৃপণতা করলে জীবনে উন্নতি করা সম্ভব হবে। ধন-সম্পদ জমাতে হলে কৃপণ হওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প পথ নেই। কিন্তু ইসলামে বলা হয়েছে যে, কৃপণতা হলো মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় শত্রু। কৃপনতা মানুষের জীবনে ধ্বংসের একটি মূল কারণ।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেছেন যে, একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) ভাষণ দিলেন এবং বলেন যে, ‘তোমরা কৃপণতার ব্যাপারে অবশ্যই সাবধান হও। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীগন কৃপণতার কারণেই ধ্বংস হয়েছেন। অর্থলোভ তাদের এই কৃপনতার নির্দেশ দিয়েছে,যার ফলে তারা কৃপণতা করেছে, তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে, যখন তারা এসব করেছেন এবং তাদের পাপাচারে প্ররোচিত করেছেন, তখন তারা তাতে লিপ্ত হয়েছেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৬৯৮)

৩. অর্থ সম্পদের লোভ :

লোভ-লালসা মানুষের জীবনকে অনেকটা বেপরোয়া করে তোলে। এর ফলে মানুষ আল্লাহর বিধান ভুলে পাপ কাজে লিপ্ত হয়। এর ফলে সে নিজেই নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

কাব ইবনে মালিক আল-আনসারি (রা.) বলছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছাগলের পালের মধ্য ছেড়ে দেওয়া হলে, পরে তারা যতটুকু না ক্ষতিসাধন করে, কারো সম্পদ ও প্রতিপত্তির লোভ এর চেয়ে অধিক বেশি ক্ষতিসাধন করে তার নিজের ধর্মের।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩৭৬)

৪. দুনিয়ার জীবনকে অধিক প্রাধান্য দেওয়া :

দুনিয়ার জীবনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। যারা দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত, মহান আল্লাহ তাদের ভিতর থেকে শান্তি ও বরকত তুলে নেয়। যার ফলে সে দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি দুটোই হারাবেন।

আবান বিন উসমান থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, জায়দ বিন সাবিত (রা.) দুপুরের সময় তার মারওয়ানের কাছ থেকে বের হয়ে এলে আমি ভাবলাম, নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য এই সময় তিনি ডেকে পাঠিয়েছে। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আমাদের শ্রুত কতৃক হাদিস শোনার জন্য মারওয়ান আমাদেরকে ডেকে পাঠিয়েছেন।

আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে, পার্থিব চিন্তা যাকে মোহগ্রস্ত করে ফেলবে, আল্লাহ তাআলা তার কাজকর্মে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে, দরিদ্রতা তার নিত্যসঙ্গী হবে এবং পার্থিব স্বার্থ ততটুকুই লাভ করতে পারবে না, যতটুকু তার তাকদিরে লিপিবদ্ধ করা আছে। আর যার প্রধান উদ্দেশ্য হবে আখিরাত, আল্লাহ তার সব কিছুই সুষ্ঠ করে দিবে, আর তার অন্তরকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করবে এবং দুনিয়ায় স্বয়ং তার সামনে এসে হাজির হবে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ৪১০৫)

৫. মানুষের জীবনে শয়তানের কুমন্ত্রণা :

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হল শয়তান, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে খারাপ পথে ধাবিত করে। প্রতিটি মানুষের জীবনে একটি করে শয়তান বাস করে, যা মানুষকে সব সময় খারাপ কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। আর মানুষ খারাপ কাজটাকেই জীবনের সাথে মানিয়ে নেয়। যার ফলে সে ভালো কাজ ভুলে যায়।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, নবী রাসুল (সা.) বলেছেন যে, ‘তোমাদের প্রত্যেকেরেই সঙ্গে একটি শয়তান নির্ধারিত রয়েছে। সাহাবারা তখন প্রশ্ন করেন, হে আমার আল্লাহর রাসুল, আপনার সঙ্গেও কি তাই আছে? রাসূল(সাঃ) তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমার সঙ্গেও তা আছে। তবে তার মোকাবেলা করার জন্য আল্লাহ আমাকে সাহায্য করেছেন। এখন আমি তার থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। এখন সে আমাকে কল্যাণকর বিষয় ছাড়া আর কখনো কোন কিছুর নির্দেশনা দেন না।’ (মুসলিম, হাদিস নং: ৭০০১)

৬. দাম্ভিকতা ও মানুষের অহংকার :

দাম্ভিকতা ও অহংকার মানুষের ব্যক্তিত্ব কে একেবারে শেষ করে ফেলে। এই দম্ভিকতা ও অহংকার তাকে সব জায়গায় সবসময় নিন্দিত করে। মহান আল্লাহ দাম্ভিক ও অহংকারী মানুষকে পছন্দ করে না।

পবিত্র আল কোরআনে ইরশাদ করা হয়েছে যে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা দাম্ভিক ও অহংকারীদেরকে পছন্দ করে না। (সুরা : আল নাহাল, আয়াত নং:২৩)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন যে, জাহান্নাম ও জান্নাত বিতর্কে লিপ্ত হলো। জাহান্নাম বলল,, অহংকারী ও পরাক্রমশালীরা স্বৈরাচারীরা আমার মধ্যে প্রবেশ করবেন। আর বেহেশত বলল, দুর্বল ও নিঃস্বরাই আমার মধ্যে প্রবেশ করবেন। আল্লাহ তাআলা তখন জাহান্নামকে বললেন যে, তুমি হলে আমার আজাব। যার থেকে ইচ্ছা আমি তোমার আজাবেন মাধ্যমে প্রতিশোধ নেব। তিনি বেহেশতকে বলেন যে, তুমি আমার রহমত, যাকে ইচ্ছা আমি তোমার মাধ্যমে তার অনুগ্রহ করব। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং : ৫৯২).

৭. গোপনে পাপ কাজ করা:

গোপন পাপ মানুষকে একেবারে শেষ করে দেয়। যারা গোপনে পাপ করে তারা হযত মনে করেন যে‘ তাদের এই কাজ কেউ দেখতে পায় না। আল্লাহ সব কিছু দেখতে পায় এটি তারা ভুলে যায়। ফলে তারা নিজের ও অন্যের ক্ষতি করে বসে।

মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন যে, তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ বর্জন করো। আর যারা পাপ করে, অচিরেই তাদের পাপের সমুচিত শাস্তি প্রদান করা হবে। (সুরা : আনআম, আয়াত নং :১২০)

৮. সময়ের মূল্য না দেওয়া:

মানুষের জীবনে সময়ের মুল্য অনেক। যারা সময়ের মূল্য দিতে যানে না তারা জীবনে উন্নতি করতে পারে না। সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। কারন একবার যে সময় চলে যায়, তা আর কখনো ফিরে আসে না। সময় থাকতে সময়ের কাজ করতে হয়।

মহাগুনি- মহাজনরা কখনো সময় নষ্ট করে না। আর যারা সময়ের মূল্য দিতে যানে না, তাদের জীবন ধ্বংস হয়ে যায। কথায় আছে সময় ও স্রোত কারো জন্যে অপেক্ষা করে না।

সাধারন প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১. কোন অভ্যাসগুলো সবচেয়ে ক্ষতিকর?

ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অলসতা, অতিমাত্রায় মোবাইল বা গেম খেলা, এবং ঋণজমা জীবন ধ্বংসকারী অভ্যাসের মধ্যে পড়ে।

২. ধূমপান জীবনকে কীভাবে ক্ষতি করে?

ধূমপান ফুসফুস, হৃদয় ও রক্তনালীকে ক্ষতি করে। দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, হার্টের সমস্যা এবং স্বাস্থ্যের হ্রাস ঘটায়।

৩. অতিরিক্ত মদ্যপান কী ধরনের প্রভাব ফেলে?

লিভার ক্ষতি, মানসিক সমস্যার সৃষ্টি, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করা এবং আর্থিক ক্ষতি ঘটাতে পারে।

৪. অনিয়মিত জীবনধারা কেন ক্ষতিকর?

ঘুম, খাদ্য ও কাজের সময় অনিয়ম স্বাস্থ্য, মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে জীবনধ্বংসী প্রভাব ফেলে।

৫. প্রোক্রাস্টিনেশন বা কাজ পিছিয়ে দেওয়ার প্রভাব কী?

অবসাদ, মানসিক চাপ, কাজের অপূর্ণতা এবং জীবনের অগ্রগতি বন্ধ করে।

৬. মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার কেন ক্ষতিকর?

মনোযোগ কমায়, ঘুমের সমস্যার সৃষ্টি করে, সম্পর্ক দুর্বল করে এবং সময় অপচয় ঘটায়।

৭. ঋণ বা অর্থসংক্রান্ত অনিয়ম কীভাবে জীবনে ধ্বংস ডেকে আনে?

অর্থনৈতিক চাপ, মানসিক চাপ, সম্পর্কের সমস্যা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা হ্রাস করে।

৮. নেতিবাচক চিন্তা ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ কী প্রভাব ফেলে?

মানসিক অসুস্থতা, হতাশা, কাজের অক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যগত সমস্যা তৈরি করে।

৯. খারাপ সঙ্গীর প্রভাব কী হতে পারে?

অসুস্থ জীবনধারা, খারাপ অভ্যাস গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়া।

১০. এসব অভ্যাস থেকে মুক্তির জন্য করণীয় কী?

নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, সময় ব্যবস্থাপনা, পজিটিভ চিন্তা এবং ভালো সঙ্গীদের সাথে থাকা জীবনে ধ্বংসকারী অভ্যাস কমাতে সাহায্য করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top