৬ – ১২ মাস বয়সী শিশুর খাবার তালিকা – খাবারের পরিমাণ ও নিয়ম

ভূমিকা

শিশুর প্রথম ছয় মাস কেবলমাত্র মায়ের দুধই তার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ৬ মাস বয়সের পর থেকে শিশুর শরীরে অতিরিক্ত পুষ্টির প্রয়োজন হয়, যা শুধুমাত্র মায়ের দুধ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

তাই এই সময়ে শিশুকে ধীরে ধীরে পরিপূরক খাবার (Complementary food) দিতে হয়। সঠিক সময়ে সঠিক খাবার দেওয়া হলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ দ্রুত হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

এই নিবন্ধে আমরা জানব – ৬ – ১২ মাস বয়সী শিশু কী ধরনের খাবার খাবে, কতবার খাবে এবং কোন কোন বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

৬ - ১২ মাস বয়সী শিশুর খাবার তালিকা - খাবারের পরিমাণ ও নিয়ম
৬ – ১২ মাস বয়সী শিশুর খাবার তালিকা – খাবারের পরিমাণ ও নিয়ম

কেন শিশুকে ৬ মাস বয়স থেকে খাবার দেওয়া জরুরি?

  • ৬ মাসের পর শিশুর বৃদ্ধি ও কার্যকলাপ বাড়ে, ফলে তার শরীরের এনার্জির চাহিদাও বাড়ে।
  • শুধু মায়ের দুধে পর্যাপ্ত আয়রন ও অন্যান্য পুষ্টি পাওয়া যায় না।
  • পরিপূরক খাবার শিশুর দাঁত ওঠা, চিবানো ও নতুন স্বাদ গ্রহণে সহায়তা করে।
  • ধীরে ধীরে শিশুকে পারিবারিক খাবারের সাথে অভ্যস্ত করে তোলে।

শিশুর খাবার কতবার দেওয়া উচিত?

শিশুর বয়স অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ও বারবার খাওয়ানোর নিয়ম আলাদা হয়ে থাকে।

  • ৬-৮ মাস বয়সে: দিনে ২ থেকে ৩ বার অল্প পরিমাণ খাবার দিন + বুকের দুধ।
  • ৯-১১ মাস বয়সে: দিনে ৩ থেকে ৪ বার খাবার দিন + বুকের দুধ।
  • ১২ মাস বয়সে: দিনে ৩ থেকে ৪ বার খাবার দিন, সাথে ১ থেকে ২ বার হালকা নাস্তা দিন।

৬ – ১২ মাস বয়সী শিশুর খাবার তালিকা

৬-৮ মাস বয়সী শিশুর খাবার

  • মায়ের দুধ (প্রধান খাবার)
  • ভাতের পাতলা খিচুড়ি (ডাল + চাল + সামান্য সবজি)
  • সুজি বা সেমাইয়ের হালকা পায়েস (দুধ ছাড়া, সামান্য ঘি ব্যবহার করা যায়)
  • ডিমের কুসুম (সিদ্ধ করে সামান্য করে দেওয়া যেতে পারে)
  • নরম আলু, কুমড়া, গাজর ম্যাশ করে
  • কলা বা পাকা পেঁপে চটকে খাওয়ানো

পরিমাণ: প্রথমে ২-৩ চামচ দিয়ে শুরু করুন, ধীরে ধীরে আধা বাটি পর্যন্ত বাড়ান।

৯-১১ মাস বয়সী শিশুর খাবার

  • মায়ের দুধের পাশাপাশি শক্ত খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
  • ভাত বা খিচুড়ি (সবজি ও ডাল মিশিয়ে)
  • ডিমের কুসুম (প্রতিদিন অল্প করে দেওয়া যেতে পারে)
  • মাছ বা মুরগির মাংস নরম করে সিদ্ধ করে ঝোলসহ
  • ডাল, শাকসবজি, আলু ভর্তা
  • সেদ্ধ নুডলস, সেমাই বা সুজি
  • দই (চিনি ছাড়া)
  • ফলের জুস, কলা, আপেল সেদ্ধ করে চটকানো

পরিমাণ: আধা বাটি থেকে শুরু করে এক বাটি পর্যন্ত দিতে পারেন।

১২ মাস বয়সী শিশুর খাবার

এ বয়সে শিশু পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতো খাবার খেতে শুরু করে। তবে খাবার নরম, সেদ্ধ বা ম্যাশ করে দিতে হবে।

  • ভাত, ডাল, সবজি, মাছ, মাংস
  • ডিম (কুসুমসহ)
  • শাকসবজি ভর্তা
  • নরম রুটি বা খিচুড়ি
  • দুধ ও দই
  • ফলমূল যেমন: কলা, আপেল, পেঁপে, আম, লিচু (মৌসুমী ফল)
  • হালকা নাস্তা: বিস্কুট, সেদ্ধ আলু, ডালিয়া, সেমাই

পরিমাণ: দিনে ৩ বেলা খাবার + ১-২ বার নাস্তা + বুকের দুধ।

৬ - ১২ মাস বয়সী শিশুর খাবার তালিকা
৬ - ১২ মাস বয়সী শিশুর খাবার তালিকা

শিশুর খাবার দেওয়ার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে

  1. প্রথমে অল্প পরিমাণ খাবার দিন এবং ধীরে ধীরে বাড়ান।
  2. খুব বেশি লবণ, চিনি বা ঝাল ব্যবহার করবেন না।
  3. খাবার অবশ্যই ভালোভাবে নরম বা ম্যাশ করে দিন।
  4. নতুন খাবার একবারে না দিয়ে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করুন।
  5. শিশুকে জোর করে খাওয়াবেন না, ধৈর্যের সাথে খাওয়ান।
  6. সবসময় খাবার দেওয়ার আগে ও পরে হাত ধুয়ে নিন।
  7. প্যাকেটজাত ও প্রিজারভেটিভ যুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।

শিশুর খাদ্য তালিকা (৬ থেকে ১২ মাস বয়স অনুযায়ী)

বয়স (শিশুর)খাবারের ধরণখাবারের উদাহরণকতবার দিবেন
৬-৮ মাসনরম ও পাতলা খাবার (মায়ের দুধ প্রধান)ভাতের পাতলা খিচুড়ি, আলু/কুমড়া/গাজর ভর্তা, কলা/পেঁপে চটকানো, সুজি/সেমাই পায়েস, ডিমের কুসুমদিনে ২-৩ বার + মায়ের দুধ
৯-১১ মাসঅল্প ঘন ও চিবোনো যায় এমন খাবারভাত/খিচুড়ি (ডাল ও সবজি সহ), মাছ/মুরগির মাংস নরম করে, ডিমের কুসুম, সেদ্ধ আলু ভর্তা, সেদ্ধ নুডলস, দই, ফলের জুস/সেদ্ধ ফলদিনে ৩-৪ বার + মায়ের দুধ
১২ মাসপরিবারের অন্যান্য খাবারের সাথে অভ্যস্ত করাভাত, ডাল, সবজি, মাছ, মাংস, ডিম, নরম রুটি/খিচুড়ি, মৌসুমি ফল (কলা, আপেল, আম, লিচু), দুধ ও দই, হালকা নাস্তা (বিস্কুট, সেদ্ধ আলু, সেমাই)দিনে ৩-৪ বার + ১-২ বার নাস্তা + মা

শিশুর খাবার তালিকা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১: ৬ মাস বয়সে কোন খাবার দিয়ে শুরু করা ভালো?
প্রথমে নরম খাবার যেমন খিচুড়ি, ভাত ম্যাশ, আলু ভর্তা বা কলা চটকানো দিয়ে শুরু করুন।

প্রশ্ন ২: শিশুকে কখন মাছ-মাংস দেওয়া যাবে?
৮-৯ মাস বয়স থেকেই মাছ বা মুরগির মাংস নরম করে দেওয়া যায়।

প্রশ্ন ৩: শিশুকে দুধের পরিবর্তে গরুর দুধ দেওয়া যাবে কি?
এক বছরের আগে গরুর দুধ সরাসরি না দেওয়া ভালো। তবে সামান্য রান্নায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রশ্ন ৪: দিনে কয়বার বুকের দুধ দিতে হবে?
৬ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত বুকের দুধ নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে। খাবারের পাশাপাশি ৬-৮ বার পর্যন্ত দিতে পারেন।

প্রশ্ন ৫: শিশুর খাবার ঝাল বা মশলাদার হলে ক্ষতি হবে কি?
হ্যাঁ, ঝাল-মশলাদার খাবার শিশুর পরিপাকের ক্ষতি করতে পারে, তাই তা এড়িয়ে চলা উচিত।

উপসংহার

শিশুর ৬ থেকে ১২ মাস বয়স হলো তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে সঠিক খাবার না পেলে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সমস্যা হতে পারে।

তাই মায়ের দুধের পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী সুষম ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। ধৈর্যের সাথে শিশুকে খাওয়ান এবং সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।

সঠিক খাবার ও যত্নই আপনার শিশুকে করে তুলবে সুস্থ, সবল ও হাসিখুশি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top